বুধবার, ৭ জুন, ২০১৭

রোজা বিষয়ে আলোচনা পর্ব ২ 


একটি নফ্স তথা একটি মানুষ কি আল্লাহকে চায়, না চায় না―এই আল্লাহকে চাওয়া আর না-চাওয়ার নামটিই হল পরীক্ষা। এই পরীক্ষাটির জন্যই মানুষকে বানানো হয়েছে। এই পরীক্ষাটি একমাত্র মানুষ ও জ্বিন ছাড়া আর কাউকেই দিতে হয় না। ফেরেস্তা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, যতই হিয়া হুয়া করতে পারুক না কেন, কিন্তু ফেরেস্তাদের পরীক্ষা দিতে হয় না। কারণ হলো, ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহ নফ্স এবং রূহ একটিও দেন নাই। নফ্স এবং রূহ দুটো একত্রে থাকলেই পরীক্ষাটি অবধারিত। যাদের কেবলমাত্র নফ্স আছে, কিন্তু রূহ নাই, তাদেরকেও পরীক্ষা দিতে হয় না এবং পরীক্ষা দেবার বিধানটি রাখা হয় নি। কারণ যদি রূহ না থাকে এবং কেবলমাত্র নফ্সটিই থাকে তা হলে সেই জীবগুলোকে মানুষ এবং জ্বিন জাতির মধ্যে গণ্য করা যায় না এবং যাবে না। সেই জীবগুলো হয়ে যাবে তখন অনেক রকম জানোয়ার এবং অনেক রকম পাখি। মানুষ এবং জ্বিন ছাড়া কোনো পশু, কোনো পাখি, কোনো মাছ অথবা কোনো প্রাণীকেই রূহ দেওয়া হয় নি। কারণ রূহ আল্লাহর আদেশ। আল্লাহর আদেশ আল্লাহ হতে আলাদা নয়। সুতরাং ঢাকনা খুলে যদি বলতে হয় তো বলতে হয় যে, রূহ স্বয়ং আল্লাহ। মানুষের মাঝে এবং জ্বিনের মাঝে রূহ আছে বলেই সেফাতি নুরের তৈরি রোবট ফেরেস্তাদেরকে আদমকে সেজদা দেবার আদেশটি দেওয়া হল। সেফাতি নুরের তৈরি আল্লাহর রোবট নামক ফেরেস্তাগুলোর সবাইকে আদমকে সেজদা দিতে বলা হলো এবং সবাই সেজদা করলো এবং সেজদা করতে বাধ্য হলো। কারণ, ফেরেস্তাদের নফ্সও নাই এবং রূহও নাই, তথা ভালো-মন্দ বিচার করার সীমিত (মৃত্যুর আগ পর্যন্তকে সীমিত বলা হয়) স্বাধীনতাটাই দেওয়া হয় নাই। যেহেতু আজাজিল জ্বিন জাতি হতে আগত এবং আজাজিল মোটেই ফেরেস্তা নয়, যদিও আজাজিলকে ফেরেস্তাদের সরদার বানানো হয়েছিল এবং সরদার এ জন্যই আল্লাহ বানিয়েছেন যে আজাজিলের মধ্যে নফ্সও ছিল, রূহও ছিল। আজাজিল নফ্স এবং রূহের অধিকারী বলেই ফেরেস্তাদের সরদার বানিয়েছেন, নতুবা সরদার বানাবার প্রশ্নই উঠে না।
অনেক গবেষক এই অতি সূক্ষ্ম বিষয়টি ধরতে পারেন না বলেই এটা সেটা বলে একটা গোঁজামিলের খিস্তি তৈরি করেন এবং না বুঝলে খিস্তি তৈরি করতে বাধ্য। সব শিয়াল যখন একই রকম শব্দ করে তখন এত শব্দের মাঝে আসল বিষয়টা চাপা পড়ে যায়। আজাজিল যেহেতু নফ্স এবং রূহ দুটোরই অধিকারী সেই হেতু সীমিত স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির অধিকারী। তাই আজাজিল আদমকে সেজদা দেয় নাই। যেহেতু ফেরেস্তাদের ওপর সেজদা দেবার হুকুমটি আজাজিলের ওপরও পড়েছিল তথা বর্তিয়েছিল সেই হেতু আজাজিলকে ইবলিসে পরিণত হতে হয়েছিল। বালাসা অর্থ অহঙ্কার। যদিও বালাসা শব্দটি আরবি নয়, বরং হিব্র“ শব্দ এবং হিব্র“ ভাষায় অহঙ্কারকে বালাসা বলা হয় এবং যে বা যিনি অহঙ্কার করে বা করেন সে বা তিনি অহঙ্কারী তথা ইবলিস। জ্বিনের মধ্যে যেমন অহঙ্কার করার অধিকারটি দেওয়া হয়েছে সে রকম মানুষের মাঝেও অহঙ্কার করার অধিকারটি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ফেরেস্তাদেরকে অহঙ্কার করার অধিকারটি দেওয়া হয় নাই। কারণ ফেরেস্তাদের মাঝে নফ্সও নাই রূহও নাই। তাই ফেরেস্তাদেরকে আল্লাহ পাকের সেফাতি নুরের তৈরি রোবটও বলা যেতে পারে। ফেরেস্তাদেরকে যেটুকু শক্তি ও ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে সেটুকুর বাহিরে একটি পা ফেলবার প্রশ্নই উঠে না। তাই তো আমরা দেখতে পাই যে, মহানবি যখন মেরাজে যাচ্ছেন ফেরেস্তা জিবরিল তখন সেদরাতুল মুনতাহায় এসে দাঁড়িয়ে গেলেন এবং বললেন যে, আর একটি পা এগিয়ে যাবার অধিকারটি তাকে দেওয়া হয় নাই। মহানবি লা মোকামে চলে গেলেন আর ফেরেস্তা জিবরিল সিদরাতুল মুনতাহায় দাঁড়িয়ে রইলেন। এত বড় জলজ্যান্ত বিষয়টি জানবার পরও কী করে মহানবিকে মাটির তৈরি বলে ওহাবিরা প্রচার করে! এরা গাছের শিকড় কেটে মাথায় পানি ঢালে। ফেরেস্তারা আল্লাহর সেফাতি নুরের তৈরি হয়েও আদমকে সেজদা করতে হয়েছে। কারণ আদমের ভেতর জাত নুরটি মওজুদ। তাই আল্লাহ বলছেন যে, ‘আমরা তোমার শাহারগের নিকটেই আছি।’ কিন্তু আল্লাহ কখনোই একথাটি বলেন নি যে, ফেরেস্তাদের শাহারগের নিকটে আছেন, অথবা জীব-জন্তুদের শাহারগের নিকটে আছেন, অথবা নদী-নালা, সাগর-মহাসাগর, পাহাড়-পর্বতের নিকটেই আছেন। আল্লাহর এই অবস্থানটি জাত-রূপে অবস্থান। তাই তিনি কেবলমাত্র মানুষ এবং জ্বিনের সঙ্গেই জাত-রূপে অবস্থান করতে পারেন। আর তাঁর সৃষ্ট বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সব কিছু সেফাতি নুর এবং নুরের অনেক রকম বিবর্তনের ধারা বজায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। তাই আল্লাহ বলছেন যে, ‘তুমি যেদিকেই তাকাও না কেন, আমি ছাড়া আর কিছুই নাই।’ আল্লাহ ছাড়া কিছুই নাই যেখানে বলা হলো সেখানে নাস্তিক্যবাদ আসে কেমন করে? কারণ নাস্তিক্যবাদ বিষয়টিই তো একটা বিরাট আত্মার রোগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। আসলে নাস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী নাস্তিকেরা আল্লাহর এই বিষয়টি অবগত নয়। যদি বিষয়টি ভাল করে বুঝতো তো তওবা করে নাস্তিক্যবাদটি পরিত্যাগ করতো। আসলে মূল বিষয়টি বুঝতে না পেরেই নাস্তিক্যবাদের প্রচার করে।

   রোজা ও ইফতার
   ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী                (চলবে)

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন