রোজা বিষয়ে আলোচনা পর্ব___৩
রোজা কী বর্জন করতে শেখায়? একটি প্রশ্নে গবেষকদের মতামত এক নয়। এতে দুঃখ অথবা বিস্ময় প্রকাশ করার কিছুই নাই। কারণ গবেষণার জ্ঞানটি আন্তরিক, কিন্তু কিছুটা তো মতভেদ থাকবেই। কোরান তফসির, হাদিসের ব্যাখ্যা, এজমা, কেয়াস, প্রতিটি বিষয়ের গবেষণার জ্ঞানটিতে আমরা অনেক রকম মতভেদ দেখতে পাই এবং এই মতভেদটিকে স্বাভাবিক মনে করেই নেওয়া হয় এবং এর মাঝে কোনো প্রকার জোর তথা বলপ্রয়োগ খাটাবার প্রশ্নই উঠে না। বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা তুলে ধরা যায়। যেমন অনেক গবেষক বলেন যে, রোজা তাগুত পরিত্যাগ করতে শেখায়। অনেকে আবার তাগুতের সঙ্গে জীবতে পরিত্যাগ করতে শেখায়। এখন প্রশ্নটি হল, তাগুতই হোক আর জীবতেই হোক, এদের থাকবার স্থানটি কোথায়? তাগুত আর জীবতে থাকবার বাসাবাড়িটি কোথায়? সৃষ্টিরাজ্যের কোথাও তাগুত এবং জীবতে বাস করে না। কারণ সৃষ্টিরাজ্য তৌহিদে বাস করে। তৌহিদের রাজ্যে তাগুতও থাকতে পারে না এবং জীবতেও থাকতে পারে না। আল্লাহর সমস্ত সৃষ্টিরাজ্যের মধ্যে মাত্র দুইটি স্থানে বা জায়গায় তাগুত এবং জীবতে বাস করে। একটি জ্বিনের অন্তর তথা হৃদয় এবং অপরটি মানুষের অন্তর। এই দুটো প্রাণীÑ জ্বিন এবং মানুষ ছাড়া আর কোথাও এইসব বাজে বিষয় থাকতে পারে না এবং থাকার আইনও নাই। সুতরাং শব্দ এবং অর্থ ভিন্ন, কিন্তু থাকবার স্থানটি মানুষ এবং জ্বিনের অন্তর। আবার অনেক গবেষক বলেন যে, রোজা বর্জন করতে শেখায় লোভ, মোহ, হিংসা, অহঙ্কার এবং সর্বপ্রকার অবৈধ কাজ। প্রশ্ন করতে পারেন যে, আমরা কি রোজার সাধনাটি করে এতগুলো আবর্জনা দূর করতে পেরেছি? এমন কথাটিও তো মহানবি সোজা বলে দিয়েছেন যে, যারা রোজা থেকে মিথ্যা কথা বলে এবং মিথ্যার আশ্রয় নেয় তাদের রোজাগুলো নিতান্ত উপবাস ছাড়া আর কিছুই নয় (হুবহু নয়)।
আবার যদি প্রশ্ন করা হয় যে, দুনিয়া, তাগুত, জীবতে, লোভ, মোহ, হিংসা, অহঙ্কার এবং খান্নাসরূপী শয়তানটিকে তাড়াতে পারলো না অথচ সারা জীবন প্রতি বছর ত্রিশটা রোজা রেখে গেল তাদের রোজার ফলটি কী হবে? উত্তরটি আল্লাহর হাতেই ছেড়ে দেওয়া হলো। নিরাশ শব্দটি উচ্চারণ করলাম না। তবে ফলটি যে কী হবে তা সবাই কমবেশি বুঝতে পারে। প্রতিটি বিষয়ের একটি উদ্দেশ্য থাকে। কিন্তু উদ্দেশ্যটিকে বাদ দিয়ে কাজ করলে কী হয় বা হবে তা সবাই বুঝতে পারে। মানুষ এত কচি খোকা নয় যে কিছুই বুঝতে পারে না। আবার অনেক সময় দেখা যায় যে, মানুষ ভালো করে বোঝে যে ধূমপান শরীরের জন্য ক্ষতিকারক, কিন্তু তবু ধূমপান করছে। বিষয়টি ভালো করে বোঝে অথচ বুঝেও কচি খোকার মত না বোঝার ভান করে। এই মানুষ যে কত রকম রং তামাশা করতে জানে এবং করে চলছে তার হিসাব কে রাখে আর এর হিসাব রেখেই বা লাভ কিসের? উপদেশের ফলটি যখন শূন্য তখন উপদেশ দেবার উৎসাহটি দুর্বল হয়ে পড়ে। ধর্মের বাণী প্রতিদিন রেডিও-টেলিভিশনে, মাইকে, ওয়াজ মাহফিলে, নামাজের খোৎবায়, পথে ঘাটে শোনানো হচ্ছে, কিন্তু লোভ-মোহের কালো অন্ধকারে সব বিষয়গুলো ঢেকে যায়। সূর্যগ্রহণ আর চন্দ্রগ্রহণের মত আস্তে আস্তে মহৎ বিষয়গুলো গিলে ফেলে। সাপ যেমন ইঁদুর গিলে খায়, কুমির যেমন আস্ত একটা মুরগি গিলে খায়, তেমন লোভ-মোহের সর্প আর কুমির মানুষের মহৎ গুণগুলোকে গিলে খায়। কেন গিলে খায়? কেন মহৎ উপদেশগুলো মানতে চায় না? কেন প্রয়োজনের চেয়ে অনেক অনেক বেশি পেয়েও কেবল পেতেই চায়? এই এত পাবার প্রচণ্ড নেশাটি কোথা হতে এল? উত্তর মাত্র একটি। মূল বিষয় মাত্র একটি। সেই উত্তর আর মূল বিষয়টি কী? প্রতিটি মানুষের অন্তরে পরীক্ষা করার জন্য আল্লাহ পাক খান্নাসরূপী শয়তানটিকে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এই খান্নাসরূপী শয়তানটি কখনো ইবলিসরূপ ধারণ করে অহঙ্কার করে। এই ইবলিস রূপটি যদি ভয়ঙ্কর হয় তাহলে মানুষের রূপটিও ভয়ংকর হয়। হিটলার, মুসোলিনি, চেঙ্গিস, হালাকু, হাজ্জাজ বিন ইউসুফ আর জারারেসের মত মানুষরূপী দানবের চেহারাটি ইতিহাসের পাতায় কলঙ্কের কালিতে লিখা হয়ে থাকে। আবার এই খান্নাসরূপী শয়তানটি কখনো মরদুদরূপ ধারণ করে সীমাহীন লোভীতে পরিণত হয়। এমনই লোভ যে লোভের সীমা নাই, শেষ নাই। যেমন আলেকজাণ্ডার দি গ্রেট। পৃথিবীটাই খেয়ে ফেলার মহাপরিকল্পনা যার অন্তরে বাসা বেঁধেছিল। এ রকম লোভীদেরকে যদি সমগ্র পৃথিবী নামক গ্রহটা দিয়ে দেওয়া হয়, হয়তো বলবে আর একটা পৃথিবী কি আছে? সব বিষয়ের একটা না একটা তলা থাকে। কিন্তু লোভের কোনো তলা নাই। এইসব ভয়ঙ্কর লোভীদের ঠিকানা হাবিয়া নামক নরক। হাবিয়া নরকটি কী ও কেমন? হাবিয়া হলো এমন একটি গর্ত যে গর্তে কেবল পড়তে থাকবে, কিন্তু তলা পাবে না তথা তলাহীন একটি গর্ত। কী মেজাজি তথা রূপক ভাষায় হাবিয়ার বর্ণনা! এই খান্নাসরূপী শয়তানটি যখন কেবলই শয়তানরূপটি ধারণ করে তখনই পাথরের আঘাত খেতে হয়। শয়তান মানুষের অন্তরে বাস করে মানুষের দেহে কত যে প্রতিদিন প্রতিঘণ্টায় পাথরের আঘাত খেয়ে যাচ্ছে তার হিসাব নাই। অথচ মানুষটি এই পাথরের আঘাতগুলো টের পেয়েও পায় না। এ যেন ক্যানসারের উপর রেডিয়ামের থেরাপি। রোগী টের পায় না, অথচ ক্যানসার ক্ষতটিকে পুড়িয়ে ফেলা হচ্ছে। শয়তান প্রতিনিয়ত পাথরের আঘাত খেয়ে চলছে আর মানুষের চেহারায় তা আস্তে আস্তে ফুটে উঠছে, কিন্তু বুঝতে পারে না। কী বিস্ময়কর বৈজ্ঞানিক আঘাত খাবার ব্যবস্থাপত্রটি দিয়ে রেখেছেন সর্বশক্তিমান আল্লাহ। তাই হয়তো বলা হয়, যেমন কর্ম তেমন ফল। কর্মের ফলটি যে ভোগ করতেই হবে, তা এ জন্মে হোক অথবা আর এক জনমে।
রোজা ও ইফতার
ডা. বাবা জাহাঙ্গীর বা-ঈমান আল সুরেশ্বরী